রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রাতের গাড়ি

এপ্রাণ, রাতের রেলগাড়ি,

           দিল পাড়ি –
      কামরায় গাড়িভরা ঘুম,
           রজনী নিঝুম।
           অসীম আঁধারে
কালি-লেপা কিছু-নয় মনে হয় যারে
     নিদ্রার পারে রয়েছে সে
          পরিচয়হারা দেশে।
     ক্ষণ-আলো ইঙ্গিতে উঠে ঝলি,
          পার হয়ে যায় চলি
     অজানার পরে অজানায়,
          অদৃশ্য ঠিকানায়।
     অতিদূর-তীর্থের যাত্রী,
          ভাষাহীন রাত্রি,
       দূরের কোথা যে শেষ
           ভাবিয়া না পাই উদ্দেশ।
      চালায় যে নাম নাহি কয়;
           কেউ বলে, যন্ত্র সে, আর কিছু নয়।
    মনোহীন বলে তারে, তবু অন্ধের হাতে
        প্রাণমন সঁপি দিয়া বিছানা সে পাতে।
    বলে, সে অনিশ্চিত, তবু জানে অতি
                 নিশ্চিত তার গতি।
    নামহীন যে অচেনা বার বার পার হয়ে যায়
           অগোচরে যারা সবে রয়েছে সেথায়,
                 তারি যেন বহে নিশ্বাস,
    সন্দেহ-আড়ালেতে মুখ-ঢাকা জাগে বিশ্বাস।
                      গাড়ি চলে,
    নিমেষ বিরাম নাই আকাশের তলে।
         ঘুমের ভিতরে থাকে অচেতনে
              কোন্‌ দূর প্রভাতের প্রত্যাশা নিদ্রিত মনে।

 

উদয়ন। শান্তিনিকেতন
  ২৮ মার্চ। ১৯৪০

আষাঢ়

নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।

ওগো আজতোরা যাস নে ঘরের বাহিরে॥

বাদলের ধারা ঝরে ঝরো-ঝরো,   আউষের ক্ষেত জলে ভরো-ভরো,

কালিমাখা মেঘে ও পারে আঁধার ঘনিয়েছে দেখ্‌ চাহি রে॥

  

ওই শোনো শোনো পাড়ে যাবে ব'লে কে ডাকিছে বুঝি মাঝিরে।

খেয়া-পারাপার বন্ধ হয়েছে আজি রে।

পুবে হাওয়া বয়, কূলে নাই কেউ,   দু কূল বাহিয়া উঠে পড়ে ঢেউ--

দরো-দরো বেগে জলে পড়ি জল ছলো-ছল উঠে বাজি রে।

খেয়া-পারাপার বন্ধ হয়েছে আজি রে॥

  

ওই ডাকে শোনো ধেনু ঘন ঘন, ধবলীরে আনো গোহালে

এখনি আঁধার হবে বেলাটুকু পোহালে।

দুয়ারে দাঁড়ায়ে ওগো দেখ্‌ দেখি, মাঠে গেছে যারা তারা ফিরিছে কি,

রাখালবালক কী জানি কোথায় সারা দিন আজি খোয়ালে।

এখনি আঁধার হবে বেলাটুকু পোহালে॥

  

ওগো, আজ তোরা যাস নে গো

তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।

আকাশ আঁধার, বেলা বেশি আর নাহি রে।

ঝরো-ঝরো ধারে ভিজিবে নিচোল,   ঘাটে যেতে পথ হয়েছে পিছল--

ওই বেণুবন দোলে ঘন ঘন পথপাশে দেখ্‌ চাহি রে॥

বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দিনের আলো নিভে এল সূয্যি ডোবে ডোবে ।
আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।
মেঘের উপর মেঘ করেছে, রঙের উপর রঙ।
মন্দিরেতে কাঁসার ঘন্টা বাজল ঢং ঢং।
ও পারেতে বিষ্টি এল, ঝাপসা গাছপালা
এ পারেতে মেঘের মাথায় একশ মানিক জ্বালা।
বাদলা হাওয়ায় মনে পড়ে ছেলেবেলার গান-
বিষ্টি পড়ে টাপুরটুপুর, নদেয় এল বান।।
আকাশ জুরে মেঘের খেলা, কোথায় বা সীমানা-
দেশে দেশে খেলে বেড়ায় কেউ করে না মানা।
কত নতুন ফুলের বনে বিষ্টি দিয়ে যায়,
পলে পলে নতুন খেলা কোথায় ভেবে পায়।
মেঘের খেলা দেখে কত খেলা পড়ে মনে,
কত দিনের লুকোচুরি কত ঘরের কণে!
তারি সঙ্গে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান-
বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এল বান।।
মনে পড়ে ঘরটি আলো, মায়ের হাসিমুখ-
মনে পড়ে মেঘের ডাকে গুরুগুরু বুক।
বিছানাটির একটি পাশে ঘুমিয়ে আছে খোকা,
মায়ের ‘পরে দৌরাত্মি সে না যায় লেখাজোকা।
ঘরেতে দুরন্ত ছেলে করে দাপাদাপি-
বাইরেতে মেঘ ডেকে উঠে, সৃষ্টি উঠে কাঁপি।
মনে পড়ে মায়ের মুখে শুনেছিলাম গান-
বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এল বান।।
মনে পড়ে সুয়োরানী দুয়োরানীর কথা,
মনে পড়ে অভিমানী কংকাবতীর ব্যাথা।
মনে পড়ে ঘরের কোণে মিটিমিটি আলো,
চারিদিকে দেয়াল জুড়ে ছায়া কালো কালো।
বাইরে কেবল জলের শব্দ ঝু-প ঝু...প ঝুপ-
দস্যিছেলে গল্প শোনে, একেবারে চুপ।
তারি সাথে মনে পড়ে মেঘলা দিনের গান-
বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এল বান।।
কবে বিষ্টি পড়েছিল, বান এল সে কোথা-
শিব ঠাকুরের বিয়ে হলো কবেকার সে কথা!
সেদিনও কি এমনিতরো মেঘের ঘটাখানা!
থেকে থেকে বাজ- বিজুলি দিচ্ছিল কি হানা!
তিন কন্যে বিয়ে করে কী হল তার শেষে!
না জানি কোন নদীর ধারে, না জানি কোন দেশে,
কোন ছেলেরে ঘুম পাড়াতে কে গাহিল গান-
বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এল বান।।